প্রাক-বাজেট আলোচনা

ভ্যাটের সিঙ্গেল রেট নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে ডিসিসিআই

আগামী বাজেটে ভ্যাটের সিঙ্গেল রেট নির্ধারণ এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ হারে ভ্যাট নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।

আগামী বাজেটে ভ্যাটের সিঙ্গেল রেট নির্ধারণ এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ হারে ভ্যাট নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। এর মাধ্যমে সামগ্রিক কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আসার পাশাপাশি ব্যবসার পরিচালন ব্যয় হ্রাস পাবে ও উৎপাদন খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছে বাণিজ্য সংগঠনটি। তাদের দাবি, বর্তমানে মূল্য সংযোজন করের (মূসক বা ভ্যাট) হার সাধারণভাবে ১৫ শতাংশ থাকলেও বিভিন্ন খাতে তা কমিয়ে ১০ শতাংশ, ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ও ৫ শতাংশ করায় ব্যবসায়ীদের জন্য জটিলতা সৃষ্টির পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। উপকরণ কর রেয়াতের সুবিধা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী বাড়তি করের বোঝা বহন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে গতকাল আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ প্রস্তাব তুলে ধরেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বিদ্যমান ঊর্ধ্বগতির মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যক্তি শ্রেণীর করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণেরও আহ্বান জানান।

সংগঠনটির অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে অটোমেটেড করপোরেট কর রিটার্ন চালু, ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র (পিএসআর) সংগ্রহে বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার, ভ্যাট ব্যবস্থা ডিজিটাল করতে ওয়েবসাইটের পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপ তৈরি ও তা ব্যবসায়ীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা।

এসব প্রস্তাব শুনে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘ব্যক্তির কর বেশি ও কোম্পানির কম হওয়া উচিত। এবার ব্যক্তির কর ৩০ শতাংশ করা হবে, যা আরো বাড়ানো উচিত। ভারতেও বেশি, উন্নত দেশে ৫০-৫৫ শতাংশ। এটাকে কমানো ঠিক হবে না, বাড়াতে হবে।’

উন্নত দেশে ব্যক্তির কর বেশি হওয়ায় বৈষম্য কম দাবি করে মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘এটা ঠিক, তারা বেশি কর দিয়ে বেশি সেবা পান। আমাদেরও সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে মানুষ হাতে কম টাকা রাখবে। ব্যবসায়ীদের তীব্র প্রতিরোধে ভ্যাটের একক হার হয়নি, তারাই এখন ভুগছে। সবাই একমত হলে, হার কিছুটা কমিয়ে হলেও একক হারে যাওয়া উচিত। আপনাদের এফবিসিসিআইকে প্রস্তাব দিতে বলেন। দরকার হলে আমরা ব্যবসায়ীদের জন্য সফটওয়্যারও করে দেব।’

প্রাক-বাজেট আলোচনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য ঢাকা চেম্বারের পক্ষে ৪২টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এ সময় সংগঠনের সভাপতি বলেন, ‘কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ট্যারিফ ভ্যালু ও বাজার মূল্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় ব্যবসায়ীদের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি প্রক্রিয়াকে জটিল ও ব্যয়বহুল করে তুলছে।’ এ অবস্থায় তিনি ট্যারিফ ভ্যালুর পরিবর্তে নির্দিষ্ট হারে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেন।

জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘দেশের ব্যবসায়ী সমাজ একমত পোষণ করলে ভ্যাটের বিভিন্ন স্তর বহাল না রেখে সরকার ভ্যাট হার সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আসতে আগ্রহী। তবে এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতা একান্ত অপরিহার্য।’

সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিগারেটের দাম বাড়ালে কোম্পানিগুলো খুশি হয়। কারণ এতে তাদের প্রফিট মার্জিন বাড়ে। কিন্তু কর বাড়ালে খুশি হয় না। এটা বুঝতে আমার একটু সময় লেগেছে, এ বিষয়টিও বিচেনায় নেয়া হবে।’

বণিক বার্তার প্রতিবেদক চোরাচালানের বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের ফোকাসটা একটু অন্যদিকে গেছে। সেজন্য সেভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। তবে কাস্টমস গোয়েন্দা তাদের রুটিন ও নিয়মিত কাজ করছে। আমরা ডিউটি কমানোর পর চিনির চোরাচালান কমেছে কিনা, সেটার তথ্য নিচ্ছি। চোরাচালান নিরোধ কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের বুধবারের সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেব।’

ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট নেয়ার জন্য নিজেই প্রতারকের ফোন কল পান বলেও জানান এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘এজন্য আমরা ফিজিক্যাল অডিট সিলেকশন বন্ধ করে দিয়েছি, টোটালি। যা হবে অটোমেটেড।’ সেজন্য অনলাইন রিটার্নকে প্রমোট করার আহ্বান জানান তিনি।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা অনলাইন রিটার্নকে পপুলার করছি। এখানে প্রতারণার কোনো সুযোগ নেই। কোনো কোনো দুর্বল মানুষ, যাদের ভয়েস কম, তাদের প্রতি বছর অডিটে পড়তে হয়। আবার এমনো মানুষ আছেন যাকে কখনো অডিটের জন্য ডাকা হয় না, এটা চরম বৈষম্য। টিআইএনধারী যে ৮০ লাখ রিটার্ন দিচ্ছেন না, তাদেরকে নোটিস করতে বলেছি। তাদেরকে খুঁজতে বলেছি। তাদের ব্যাংক সার্চ দিতে বলেছি। তাদের যাবতীয় খবর নিতে বলেছি। তাদের এনআইডি তো আমাদের কাছে আছে।’

এছাড়া প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন আলু কেনার ক্ষেত্রে ১ শতাংশ এআইটি হ্রাস করা, কোল্ড স্টোরেজের বিভিন্ন দ্রব্যাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট ও এআইটি প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে।

বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন (বাপা) কৃষিজ পণ্য সরবরাহের বিপরীতে উৎসে কর কর্তনে অব্যাহতি, বিক্রয়ের ওপর ন্যূনতম আয়কর শূন্য দশমিক ৬০ বাতিল করা, মূসকের আদর্শ হার হ্রাস করার প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশ ফিনিশড লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন স্থানীয় বাজার থেকে চামড়া সংগ্রহের সময় অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে।

আরও